
– আমজাদ আকাশ –
স্কুলের গণ্ডি পার হওয়ার আগেই বাম রাজনীতির যুক্ত হয়েছিলেন। রাত পালিয়ে দেওয়ালে দেওয়ালে লিখতেন বিপ্লবী স্লোগান। সমাজ পরিবর্তনের স্বপ্নে ছিলেন বিভোর। স্লোগান মূখর সময়ে তিনি নিজেকে আঁকিয়ে হিসেবে আবিস্কার করলেন। দেখলেন ভালো ছবি আঁকতে পারেন। পার্টিও তা-ই দেখলো। মেট্ট্রিকুলেশনের পর তৎকালীন কমিউনিস্ট পার্টির পক্ষ থেকে তাঁকে বলা হলো আর্ট স্কুলে ভর্তি হতে। তাঁর মনেও চিত্রশিল্পী হওয়ার সুপ্ত বাসনা। সময়টা ১৯৪৯। মূর্তজা বশীর শিল্পী হওয়ার অসীম স্বপ্ন নিয়ে নব প্রতিষ্ঠিত ঢাকা আর্ট স্কুলে ভর্তি হলেন।
শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীনের নের্তৃত্বে তঁৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের রাজধানী ঢাকায় আর্ট স্কুল চালু হয়েছে। একটি ব্যাচ অলরেডি ভর্তি হয়ে ক্লাস করছে। মূর্তজা বশীর তার পিতা জ্ঞানতাপস ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহকে জানালেন যে, তিনি আর্ট স্কুলে পড়তে চান। পিতা রাজি নন, কিন্তু পুত্র আর্ট স্কুলে পড়বেনই। পুত্র আজন্ম বিদ্রোহী। শুরু হলো পিতা-পুত্রের ইচ্ছের লড়াই। পুত্রেরই জয় হলো। সিদ্ধান্ত নিলেন নিজেই নিজের পরিচয় তৈরি করবেন। পিতার খ্যাতির বলয়ের বাইরে গিয়ে নিজের যোগ্যতায় রচনা করবেন নিজের খ্যাতি। প্রথমেই নজর দিলেন নিজের নামের দিকে। পিতার দেওয়া নাম মূর্তজা বশীরুল্লাহ থেকে উল্লাহ বাদ দিলেন। হয়ে গেলেন মূর্তজা বশীর। বলার অপেক্ষাই রাখে না যে, মূর্তজা বশীর বাংলাদেশের শিল্পকলার ইতিহাসে এক অনবদ্য নাম।
একদিন স্যারকে জিজ্ঞেস করলাম- আপনার বাবা কি সহজে রাজি হয়েছিলেন? উত্তরে তিনি বললেন- আরে না, বাবা তো কিছুতেই রাজি হচ্ছিলেন না। তিনি আমাকে শিল্পীদের করুন জীবন নিয়ে নানা আমাকে বুঝিয়েছেন আমি যেন আর্ট স্কুলে ভর্তি না হই। তিনি আমাকে বললেন কি, দেখো বশিরুল্লাহ শিল্পী জীবন ভয়াবহ কষ্টের। এ রকম নিচু জীবন তুমি যাপন করো আমি তা চাই না। কিন্তু আমার মনে তো শিল্পী হওয়া ছাড়া আর কোন দ্বিতীয় চিন্তা ছিল না। শিল্পী তো আমি হবোই। বাবুকেও আমি তা-ই বললাম। অবশেষে বাবা রাজি হলেন। শিল্পকলা বিষয়ে অনেক বই বাবার সংগ্রহে ছিল। সেগুলো আমাকে দিলেন। যা আগে আমার দেখার অধিকার ছিল না।
রাজনৈতিক কারণেই মূর্তজা বশীর আর্ট স্কুলে ভর্তি হয়েছিলেন। ভর্তি হওয়ার পর তা আরো জোরে-শোরে চালাতে লাগলেন। বগুড়া করোনেশন স্কুলে পড়ার সময় থেকেই ভাষা আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ১৯৪৮ এ, ভাষা আন্দোলনের প্রাথমিক পর্যায়ে, তিনি বগুড়া শহরে আন্দোলনের জন্য বেশ কয়েকটি মিছিল এবং মিটিং আয়োজনে কাজ করেছিলেন তিনি। ১৯৫০ সালে গ্রপ্তার হয়ে নির্দোষ প্রমানিত হওয়ায় ৫ মাস কারভোগ করার পর মুক্তি পান। ২১শে ফেব্রুয়ারি ১৯৫২ তে তিনি ১৪৪ ধারা অমান্য করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমতলার সমাবেশে যোগ দিয়েছিলেন। তিনি ফেব্রুয়ারি ২২ তারিখের গায়েবানা জানাজাতেও অংশ নেন এবং পুলিশ আন্দোলনকারীদের গ্রেপ্তার করার চেষ্টা করলে তারা পলাতক থাকতে বাধ্য হয়েছিলেন। তিনি আন্দোলনের জন্য অনেক কার্টুন এবং ফেস্টুন এঁকেছেন। তার কার্টুনগুলো দেশ ও ভাষার জন্য লড়াই এবং ত্যাগের কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়। ২১ ফেব্রুয়ারি নিয়ে হাসান হাফিজ সংকলিত প্রথম কবিতা সংকলেন ইলাস্ট্রেশন করেন শিল্পী মূর্তজা বশীর। এছাড়াও বাংলা ও বাঙালীর প্রতিটি স্বাধীকার আন্দোলনে শিল্পী মূর্তশা বশীর সংক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন।
১৯৫৪ সালে আর্ট স্কুলের ৫ বছর মেয়াদী চারুকলা শিক্ষা সমাপ্ত করে ঢাকার নবাবপুর স্কুলে কিছুদিন চারুকলা শিক্ষক হিসেবে কাজ করেন। ১৯৫৬ সালে চারুকলা বিষয় উচ্চ শিক্ষা গ্রহন করতে পাড়ি জমান ইতালূর ফ্লোরেন্স শররে চলে যান।